পিরোজপুর মৌজার প্রথম নির্মিত দালান ।
সি আই পাড়া সর্দার বাড়ি পিরোজপুর মৌজার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা মৌজাটির প্রাথমিক বসতি ও নির্মাণ ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পিরোজপুর মৌজার প্রণীত প্রাথমিক SA নকশায়, উক্ত সময়ে এই ভবনটিই এলাকাটিতে একমাত্র বিদ্যমান নির্মিত স্থাপনা ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সি আই পাড়া সর্দার বাড়িকে পিরোজপুর মৌজায় নির্মিত প্রথম ভবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

SA নকশা মৌজাভিত্তিক ভূমি ও অবকাঠামো সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক সরকারি নথি, যেখানে মৌজার ভৌগোলিক সীমানা, দাগ নম্বর, যোগাযোগপথ, জলাশয় এবং তৎকালীন নির্মিত স্থাপনাসমূহের অবস্থান পদ্ধতিগতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। উক্ত নকশায় পিরোজপুর মৌজা এলাকায় একমাত্র স্থাপনা হিসেবে সি আই পাড়া সর্দার বাড়ির উপস্থিতি নথিভুক্ত রয়েছে, যা ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নথিগতভাবে প্রতিপন্ন করে।

এই স্থাপনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে সি আই পাড়া ও পিরোজপুর মৌজার বিভিন্ন অংশে পর্যায়ক্রমে জনবসতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিকাশ ঘটে। প্রাচীনত্ব, নথিভুক্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং স্থানীয় ইতিহাসে গুরুত্বের কারণে সি আই পাড়া সর্দার বাড়ি পিরোজপুর মৌজার একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সম্রাট শের শাহ সুরি (১৫৪০-১৫৪৫) কেবল এক ক্ষণজন্মা শাসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অপরাজেয় সামরিক শক্তির প্রতীক। তাঁর সেনাবহিনীতে অন্তর্ভুক্ত খান, পাঠান, মোল্লা এবং সর্দার পদবীধারী যোদ্ধারা ছিলেন মধ্য এশিয়ার সমরকৌশলে দক্ষ এক একটি দুর্ধর্ষ শক্তি। শের শাহের মৃত্যুর পরবর্তী অস্থিতিশীল সময়ে মুঘলদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং মধ্যপথে মুঘল-মারাঠা-রাজপুত জোটের সাঁড়াশি আক্রমণের ফলে এই দুর্ধর্ষ বাহিনীর একটি বিশাল অংশ নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের পথ হারান। এই ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতাই তাঁদের পূর্ব বাংলার দুর্গম ও জনবসতিহীন ব্রাত্য জনপদগুলোর দিকে ঠেলে দেয়। পূর্ব বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই দুর্গম ভূখণ্ডে প্রথম মানব-বসতি স্থাপনকারী ছিলেন শের শাহের সাথে এসে আটকে পড়া এই আফগান, পশতুন, পাঞ্জাবী ও বেলুচ মুসলিম যোদ্ধারা। পিরোজপুরের ঐতিহাসিক ‘সি আই পাড়া সর্দার বাড়ি’ এই শৌর্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের এক জীবন্ত মহাফেজখানা। এই বাড়ির আদি পুরুষগণ ছিলেন শের শাহের সেই রণকৌশলী সর্দার বাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্য, যাঁরা প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে এই জনপদকে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। তাঁদের লড়াকু মানসিকতা এবং স্বাধীনচেতা স্বভাবের কারণে এই অঞ্চলে মুঘল আধিপত্য কিংবা পরবর্তীকালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কখনোই সুসংহত হতে পারেনি। বাংলার ইতিহাসে বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধ কিংবা স্বাধীন সুলতানি ও নবাবী আমলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নেপথ্যে এই লড়াকু বসতিগুলোই ছিল শক্তির প্রধান উৎস। দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসনকে অস্বীকার করার যে দুঃসাহস বাংলা যুগে যুগে দেখিয়েছে, তার মূলে ছিল পিরোজপুরের মতো স্বাধীন মুসলিম অঞ্চলগুলো। এই অঞ্চলগুলো মূলত দিল্লী-বিমুখ এক একটি স্বায়ত্তশাসিত শক্তির কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। নামতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই স্বাধীন অঞ্চলগুলোর নামের শেষে “পুর” (যেমন: পিরোজপুর, ফিরোজপুর) শব্দটি একটি গূঢ় অর্থ বহন করে। এখানে “পুর” কেবল জনপদবাচক প্রত্যয় নয়, বরং এটি সংস্কৃত ও ফারসি শব্দের সংমিশ্রণে গঠিত একটি ‘সুরক্ষিত সামরিক দুর্গ’ বা ‘অভেদ্য আবাসভূমি’র পরিচায়ক। এই সুরক্ষিত “পুর” বা দুর্গগুলোই ছিল বাংলার স্বাধীন চেতনার আদি সুতিকাগার, যেখানে প্রতিটি বসতি ছিল এক একটি অজেয় শক্তিকেন্দ্র।

১৭০০ শতকে ফিরোজ উদ্দিন সরদার তার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে পিরোজপুরে জনবসতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নামেই এই অঞ্লের নামকরণ হয় ফিরোজপুর (পরবর্তীতে পিরোজপুর)।

ফিরোজ উদ্দিন সরদার নবাব আলীবর্দি খানের অধীনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার কারণে তিনি দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি ঘসেটি বেগম ও রায়দুর্লভের ষড়যন্ত্রের শিকার হন। ১৭৫৩ সালে নবাববাড়ি প্রাঙ্গণে তিনি শাহাদত বরণ করেন।

১৭৫১ সালে আগা বাকের খান এবং ফিরোজ উদ্দিন সরদারের সাথে নবাব আলীবর্দী খানের কন্যা ঘসেটি বেগম, তার স্বামী নওয়াজিশ আলী খান এবং নওয়ারা পেশকার রাজবল্লভের বিবাদ শুরু হয়। ত্রিপুরার শাসনকর্তা উমিদ ঢাকায় এসে আগা বাকের খান এবং ফিরোজ উদ্দিন সরদারকে আক্রমণ করলে তারা আরাকানী রাজার নিকট সাহায্য চাইলে সরদার লেয়া মুরারিকে এক হাজার যুদ্ধ জাহাজ সহ পাঠানো হয়। এর ফলে আগা বাকের ও ফিরোজ সরদার উমিদকে পরাজিত করেন।

পরবর্তীতে নবাব সিরাজুদ্দৌলা তাদের মুর্শিদাবাদে বন্দি করেন এবং মুক্তির পর ঢাকায় হোসেন আবেদীন ও তার দলকে আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। ১৭৫৩ সালে আগা বাকের খান ও ফিরোজ উদ্দিন সরদার হোসেন আবেদীনকে হত্যা করেন। ঘসেটি বেগম ও রাজবল্লভের ষড়যন্ত্রের ফলে নবাববাড়িতে শরবতে বিষ প্রয়োগ করা হয় এবং ফিরোজ উদ্দিন সরদার, আগা বাকের খান ও আরও সৈন্য ১৭ জন শহীদ হন।[১]

জমিদারি উত্তরাধিকার

সম্পাদনা

ফিরোজ উদ্দিন সরদারের উত্তরসূরিরা —

সলিম উদ্দিন সরদার (১৭৪০)

এলেম উদ্দিন সরদার (১৭৮১)

কুতুব উদ্দিন সরদার (১৮১৫)

কিতাব উদ্দিন সরদার (১৮৫৩)

নাজিম উদ্দিন সরদার (১৮৭৮)

নিজাম উদ্দিন সরদার (১৮৮২)

কোরবান আলী সরদার (১৯২২)

C.S. রেকর্ড অনুযায়ী, তারা পিরোজপুর ও নামাজপুর মৌজার অত্র এলাকার নিজ মালিকানাধীন রেকর্ডভুক্ত হওয়া বড় ভূস্বামী ছিলেন। তাদের মালিকানাধীন জমির দাগ নম্বর ছিল —

৮৮৮, ৬৩৮,+৬৩৯,+-৬৪০,৬৪১,৬৪২,৬৪৩,+৬৪৫,৬৪৫, ৬৪৬–৬৪৮, ৬৭৫–৬৭৭, ৬৮১–৭৮৪, ১০০৮, ১০৪৬, ১০৫২, ১৫১৭ ইত্যাদি। এস.এ. ও বি.এস. রেকর্ডেও তাদের উত্তরসূরিদের নামে ভূমি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।

ফিরোজ উদ্দিন সরদারের শাহাদতের পর রায়দুর্লভ এই জমিদারিকে নিজের দখলে নিতে চেষ্টা করলেও সরদার পরিবারের প্রতিরোধে ব্যর্থ হন। মূল ফিরোজপুর সহর ও দক্ষিণাঞ্চল কখনো রায়দুর্লভের অধীনে যায়নি। ১৯০০ সালের পরের C.S. ও S.A. রেকর্ডেও এই ভূমি সরদার পরিবারের নামে থেকে যায়।[

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।